কীভাবে মেখলা চাদর পরতে হয়

মেখলা চাদর: আসামের ঐতিহ্যবাহী পোশাকের বিভিন্ন ধরন এবং পরার সহজ গাইড

Read this in – English/हिन्दी/असमिया

বাঙালি নারীর আলমারি যেমন লিনেন, জামদানি বা বালুচরির গল্প বলে, ঠিক তেমনই অসমীয়া সংস্কৃতির প্রাণ লুকিয়ে আছে ‘মেখলা চাদর’ (Mekhela Chador)-এর ভাঁজে ভাঁজে। প্রথম দেখায় এটিকে সাধারণ শাড়ি মনে হতে পারে, কিন্তু মেখলা চাদরের গঠনশৈলী এবং পরার ধরন সাধারণ শাড়ির চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। এটি আসলে একটি দুই খণ্ডের (Two-piece) পোশাক, যা পরিধানকারীকে দেয় এক অপূর্ব রাজকীয় আভিজাত্য এবং অসামান্য আরাম।

আজ Vunavya-র এই বিশেষ ব্লগে আমরা জানব মেখলা চাদরের বিভিন্ন ধরন এবং অত্যন্ত সহজ কিছু ধাপে এটি নিখুঁতভাবে পরার নিয়ম।

মেখলা চাদর আসলে কী?

নামটির মধ্যেই লুকিয়ে আছে এর রহস্য। এই পোশাকটির দুটি মূল অংশ থাকে:

১. মেখলা (Mekhela): এটি হলো পোশাকের নিচের অংশ। এটি একটি নলাকার বা স্কার্টের মতো কাপড়, যা কোমরে প্লিট বা কুঁচি দিয়ে পরা হয়।

২. চাদর (Chador): এটি হলো ওপরের অংশ। লম্বা এই কাপড়ের এক প্রান্ত মেখলার সাথে গুঁজে অন্য প্রান্তটি শাড়ির আঁচলের মতো কাঁধের ওপর দিয়ে ছড়িয়ে দেওয়া হয়।

মেখলা চাদরের বিভিন্ন ধরন ও আনুমানিক দাম

আসামের তাঁতিরা বিভিন্ন ধরনের সুতো এবং সিল্ক দিয়ে অত্যন্ত যত্নের সাথে এই ঐতিহ্যবাহী পোশাক বুনে থাকেন:

  • ১. মুগা মেখলা চাদর (Muga Mekhela Chador): আসামের নিজস্ব সোনালী ‘মুগা সিল্ক’ দিয়ে তৈরি এই মেখলা চাদর সবচেয়ে মূল্যবান এবং রাজকীয়। এর সোনালী উজ্জ্বলতা বয়সের সাথে সাথে আরও বাড়ে। একটি খাঁটি হ্যান্ডলুম মুগা মেখলা চাদরের দাম সাধারণত ২০,০০০ টাকা থেকে শুরু করে ৫০,০০০ টাকা বা তার বেশিও হতে পারে।
  • ২. পাত মেখলা চাদর (Paat Mekhela Chador): এটি খাঁটি মালবেরি সিল্ক দিয়ে তৈরি হয়। কনেদের বিয়ের সাজে ভারী জরির কাজ করা পাত মেখলা চাদরের জুড়ি মেলা ভার। নকশা ও কাজের ওপর নির্ভর করে এর দাম ৮,০০০ থেকে ২৫,০০০ টাকার মধ্যে হয়ে থাকে।
  • ৩. এরি মেখলা চাদর (Eri Mekhela Chador): এরি সিল্ক অত্যন্ত নরম এবং গরম হওয়ায় এর মেখলা চাদরগুলো শীতকালে পরার জন্য দারুণ আরামদায়ক। একটি খাঁটি এরি মেখলা চাদরের দাম সাধারণত ৩,০০০ থেকে ৮,০০০ টাকার মধ্যে পাওয়া যায়।
  • ৪. কটন ও টসর মেখলা চাদর: দৈনন্দিন ব্যবহারের জন্য বা হালকা কোনো অনুষ্ঠানে পরার জন্য সুতি (Cotton) এবং টসর সুতোর মেলবন্ধনে তৈরি মেখলা চাদরগুলো এখন ভীষণ জনপ্রিয় ও আরামদায়ক। এগুলোর দাম সাধারণত ১,৫০০ থেকে ৪,০০০ টাকার মধ্যে থাকে।

কীভাবে মেখলা চাদর পরবেন?(এখানে ক্লিক করুন)

শাড়ির কুঁচি সামলানো যাদের কাছে কঠিন মনে হয়, তাদের জন্য মেখলা চাদর পরা অনেক সহজ! নিচে ৫টি সহজ ধাপ দেওয়া হলো:

ধাপ ১: সঠিক অন্তর্বাস বা পেটিকোট মেখলা চাদর পরার জন্য প্রথমে একটি সাধারণ পেটিকোট বা ইনস্কার্ট এবং ম্যাচিং ব্লাউজ পরে নিন। কাপড়ের ভারী ভাব ধরে রাখার জন্য পেটিকোটের ফিতেটি কোমরে একটু শক্ত করে বাঁধুন।

ধাপ ২: মেখলা পরিধান (নিচের অংশ) মেখলা কাপড়টি গোল স্কার্টের মতো পায়ের দিক থেকে গলিয়ে কোমরের কাছে নিয়ে আসুন। এবার শাড়ির মতো কুঁচি বা প্লিট করতে হবে, তবে মাত্র ২ থেকে ৩টি বড় প্লিট করলেই চলে। অসমীয়া ঐতিহ্য অনুযায়ী, এই প্লিট বা ভাঁজগুলোর মুখ শাড়ির মতো বাঁদিকে না হয়ে ডানদিকে থাকবে। প্লিটগুলো করে কোমরের পেটিকোটে সুন্দরভাবে গুঁজে দিন।

ধাপ ৩: চাদরের শুরু (ওপরের অংশ) এবার চাদরটি নিন। চাদরের এক প্রান্ত আপনার মেখলার কুঁচির ঠিক ওপর থেকে শুরু করে কোমরের চারদিকে একবার ঘুরিয়ে পেটের কাছে এনে গুঁজে (Tuck) দিন।

ধাপ ৪: আঁচল বা চাদরের ড্রেপিং কোমরে গোঁজার পর চাদরের বাকি অংশটি আপনার পিঠের দিক থেকে ঘুরিয়ে এনে বাম কাঁধের ওপর দিয়ে সামনে ঝুলিয়ে দিন, ঠিক যেভাবে আমরা শাড়ির আঁচল ফেলি। আপনি চাইলে আঁচলটি কুঁচি করে পিন করতে পারেন, অথবা ছড়ানো অবস্থায় (Open Pallu) রাখতে পারেন।

ধাপ ৫: চূড়ান্ত টাচ ও সেফটি পিন মেখলা এবং চাদর যাতে জায়গা থেকে সরে না যায়, তার জন্য কোমরের কাছে এবং বাম কাঁধের ব্লাউজের সাথে দুটি সেফটি পিন দিয়ে লক করে দিন। ব্যাস! আপনি এখন আসামের ঐতিহ্যবাহী সাজে একদম তৈরি।

শেষ কথা

মেখলা চাদর শুধু একটি পোশাক নয়, এটি ভারতের সমৃদ্ধ টেক্সটাইল ঐতিহ্যের এক চমৎকার নিদর্শন। এর আধুনিক ডিজাইন ও আরামদায়ক গঠনের কারণে আজ আসামের বাইরেও সমস্ত ভারতের নারীদের মধ্যে এর জনপ্রিয়তা উপচে পড়ছে।

Vunavya সর্বদা চেষ্টা করে ভারতের এই রূপালী-সোনালী সুতোর ঐতিহ্যগুলোকে আপনাদের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে। আসামের এই অনন্য মেখলা চাদরের সাজ আপনার কেমন লাগে? আপনার কালেকশনে কি কোনো মেখলা চাদর আছে? আমাদের কমেন্ট বক্সে অবশ্যই জানান!

Leave a Comment

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Shopping Cart
Scroll to Top