আসামের হারানো রত্ন: ‘বৃন্দাবনী বস্ত্র’-এর আধ্যাত্মিক ও ঐতিহাসিক বুনন
Read this in – English/हिन्दी /অসমীয়া
আসামের তাঁতশিল্পের কথা বললে আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে মুগা বা পাত সিল্কের স্নিগ্ধ রূপ। কিন্তু আসামের তাঁতিদের দক্ষতা কেবল পোশাক তৈরির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, তা পৌঁছে গিয়েছিল আধ্যাত্মিকতার এক চরম শিখরে। আজ Vunavya-র এই ঐতিহাসিক ব্লগে আমরা আলোচনা করব ১৬শ শতাব্দীর এমন এক বিস্ময়কর সৃষ্টির কথা, যা আসামের বুনন শিল্পকে গোটা বিশ্বের দরবারে এক অনন্য স্বীকৃতি দিয়েছে। সেই অমূল্য রত্নটির নাম হলো— বৃন্দাবনী বস্ত্র।

বৃন্দাবনী বস্ত্র কী?
‘বৃন্দাবনী বস্ত্র’ হলো ১৬শ শতাব্দীতে বোনা একটি বিশাল সিল্কের কাপড় বা টেপেস্ট্রি (Tapestry), যার বুকে অত্যন্ত নিপুণভাবে সুতোর মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা হয়েছিল ভগবান শ্রীকৃষ্ণের বৃন্দাবনের নানা লীলা। এটি কোনো সাধারণ এমব্রয়ডারি বা সুতোর কাজ ছিল না, বরং তাঁতের ওপর সরাসরি বোনা এক জাদুকরী ক্যানভাস।

মহাপুরুষ শ্রীমন্ত শংকরদেব এবং এই বস্ত্রের সৃষ্টি
এই মহাকাব্যিক বস্ত্রটির সৃষ্টির পেছনে রয়েছেন আসামের নববৈষ্ণব ধর্মের প্রবর্তক এবং সমাজ সংস্কারক, মহাপুরুষ শ্রীমন্ত শংকরদেব।
ইতিহাস থেকে জানা যায়, কোচ রাজবংশের বীর সেনাপতি চিলরায় (Chilarai) শ্রীমন্ত শংকরদেবকে শ্রীকৃষ্ণের বৃন্দাবন লীলা কাপড়ের ওপর ফুটিয়ে তোলার জন্য অনুরোধ করেছিলেন। শংকরদেব এই বিশাল দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি নিজে এই কাপড়ের নকশা বা মোটিফগুলো তৈরি করেন এবং আসামের বরপেটা (Barpeta) অঞ্চলের তাঁতকুচিতে প্রায় ১২০ জন দক্ষ তাঁতিকে এই কাজের জন্য নিযুক্ত করেন। টানা এক বছর কঠোর পরিশ্রমের পর এই জাদুকরী বস্ত্রটি তৈরি হয়, যার দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় ১২০ হাত এবং প্রস্থ ছিল ৬০ হাত!
সুতোর বুননে কৃষ্ণের লীলা
বৃন্দাবনী বস্ত্রের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ ছিল এর নিখুঁত বুনন। রঙিন সিল্কের সুতো—বিশেষ করে লাল, কালো, সাদা, হলুদ এবং সবুজ রঙের সুতো ব্যবহার করে এই বস্ত্রটি বোনা হয়েছিল। এতে কৃষ্ণের জীবনের নানা উল্লেখযোগ্য ঘটনা, যেমন:
- কালীয় দমন (Kaliya Daman)
- বকাসুর বধ
- বস্ত্রহরণ লীলা
- গোপীদের সাথে রাসলীলা
খুব সূক্ষ্মভাবে তাঁতের সাহায্যে ফুটিয়ে তোলা হয়েছিল। শুধু ছবি নয়, এর ভেতরে প্রাচীন অসমীয়া লিপিতে শ্লোকও বোনা ছিল, যা সেকালের তাঁতিদের অবিশ্বাস্য দক্ষতার প্রমাণ দেয়।

বর্তমানে কোথায় আছে এই অমূল্য সম্পদ?
দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, শ্রীমন্ত শংকরদেবের তত্ত্বাবধানে বোনা সেই মূল বৃন্দাবনী বস্ত্রটি আজ আর সম্পূর্ণ অবস্থায় ভারতে নেই। সময়ের সাথে সাথে এটি খণ্ড খণ্ড হয়ে যায় এবং এর বড় অংশগুলো ইউরোপে চলে যায়।
বর্তমানে এই ঐতিহাসিক বস্ত্রের সবচেয়ে বড় এবং বিখ্যাত অংশটি সংরক্ষিত রয়েছে লন্ডনের ব্রিটিশ মিউজিয়ামে (British Museum)। এছাড়া প্যারিসের গিমে মিউজিয়াম (Guimet Museum) এবং আরও কিছু আন্তর্জাতিক সংগ্রহালয়ে এর খণ্ডাংশ অতি সযত্নে সংরক্ষিত আছে।
উপসংহার
বৃন্দাবনী বস্ত্র কেবল একটি কাপড় নয়, এটি আসামের তাঁতিদের মেধা, ধৈর্য এবং শ্রীকৃষ্ণের প্রতি ভক্তির এক চূড়ান্ত নিদর্শন। যদিও মূল বস্ত্রটি আজ আমাদের থেকে বহু দূরে, তবুও সেই প্রাচীন বুননশৈলী এবং নকশার অনুপ্রেরণা আজও আসামের তাঁতশিল্পীদের মনে বেঁচে আছে। Vunavya আসামের এই হারিয়ে যাওয়া রত্ন এবং তাঁতিদের এই অবিস্মরণীয় ইতিহাসকে গভীর শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে।
