আসামের উপজাতীয় বুনন

আসামের উপজাতীয় বুনন: বোড়ো, মিসিং এবং কার্বি টেক্সটাইলের জাদুকরী রূপ

Read this in – English/हिन्दी/असमिया

আসামের নাম শুনলেই আমাদের চোখে ভেসে ওঠে সোনালী মুগা কিংবা শুভ্র পাত সিল্কের কথা। কিন্তু আসামের বস্ত্রশিল্পের ক্যানভাস কেবল এই দুটি রঙেই সীমাবদ্ধ নয়। এই রাজ্যের পাহাড়ে এবং সমতলে বসবাসকারী বিভিন্ন উপজাতি বা জনজাতিদের (Tribal Communities) নিজস্ব আলাদা তাঁতশিল্প রয়েছে, যা রঙের বৈচিত্র্য এবং জ্যামিতিক নকশায় এক কথায় অতুলনীয়।

প্রতিটি জনজাতির পোশাক তাদের ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং প্রকৃতির সাথে গভীর সম্পর্কের গল্প বলে। আজ Vunavya-র এই ব্লগে আমরা জানব আসামের তিনটি প্রধান উপজাতি—বোড়ো, মিসিং এবং কার্বি সম্প্রদায়ের অনন্য বুননশৈলী সম্পর্কে।

১. বোড়ো (Bodo) টেক্সটাইল: প্রকৃতির ছোঁয়া এবং ‘দখনা’

বোড়ো উপজাতি আসামের অন্যতম বৃহৎ এবং প্রাচীন জনজাতি। বোড়ো নারীদের ঐতিহ্যবাহী পোশাকের নাম হলো ‘দখনা’ (Dokhona)। এটি একটি লম্বা চাদরের মতো কাপড়, যা বুক থেকে গোড়ালি পর্যন্ত পেঁচিয়ে পরা হয়।

  • নকশা ও বৈশিষ্ট্য: দখনার জমিন সাধারণত উজ্জ্বল হলুদ রঙের হয় (যাকে তারা ‘Gwtham’ বলে)। এর ওপর বোনা থাকে অত্যন্ত দৃষ্টিনন্দন মোটিফ। বোড়ো বুননের মূল অনুপ্রেরণাই হলো প্রকৃতি। তাদের কাপড়ে ‘পাহাড়’ (Hajw Agor) বা বিভিন্ন ‘ফুল’-এর মোটিফ খুব নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়। এছাড়াও তাদের বোনা ‘অরনাই’ (Aronai) বা স্কার্ফ সম্মান প্রদর্শনের জন্য সারা ভারতে বিখ্যাত।
  • আনুমানিক দাম: একটি খাঁটি হাতে বোনা সুতির দখনা এবং অরনাই সেটের দাম সাধারণত ১,৫০০ থেকে ৪,০০০ টাকার মধ্যে হয়ে থাকে। সুতোর মান এবং নকশার ঘনত্বের ওপর ভিত্তি করে দাম পরিবর্তিত হয়।

২. মিসিং (Mising) টেক্সটাইল: জ্যামিতিক নকশার মাস্টারপিস

ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে বসবাসকারী মিসিং জনজাতির তাঁতিরা অত্যন্ত দক্ষ। তাদের বোনা কাপড় দূর থেকেই চেনা যায় এর অনন্য জ্যামিতিক নকশার জন্য।

  • নকশা ও বৈশিষ্ট্য: মিসিং নারীদের প্রধান পোশাক হলো ‘এগে’ (নিচের অংশ) এবং ‘গাচেং’ (ওপরের অংশ)। তবে তাদের সবচেয়ে বিখ্যাত বুনন হলো ‘মিরিজিম’ (Mirijim)। এটি মূলত একটি ভারী চাদর বা শাল। মিরিজিমের নকশায় কালো, লাল, সাদা এবং হলুদ রঙের তীব্র বৈপরীত্য (Contrast) দেখা যায়। নিখুঁত জ্যামিতিক আকার, যেমন—ত্রিভুজ, রম্বস বা চারকোনা বাক্স তাদের বুননের প্রধান আকর্ষণ।
  • আনুমানিক দাম: মিসিং তাঁতিদের হাতে বোনা ঐতিহ্যবাহী মিরিজিম শাল বা চাদরগুলোর দাম সাধারণত ২,০০০ টাকা থেকে শুরু করে ৪,৫০০ টাকা পর্যন্ত হয়।

৩. কার্বি (Karbi) বুনন: লাল-কালোর উজ্জ্বল আভিজাত্য

পাহাড়ি জনজাতি কার্বিদের বুননশৈলী অত্যন্ত উজ্জ্বল এবং তাদের নিজস্ব ঐতিহ্যবাহী তাঁতে বোনা হয়।

  • নকশা ও বৈশিষ্ট্য: কার্বি নারীদের ঐতিহ্যবাহী পোশাককে ‘পিনি’ (Pini) বা ‘পেকক’ (Pekok) বলা হয়। তাদের কাপড়ে সাধারণত লাল এবং কালো রঙের ভীষণ সুন্দর প্রাধান্য দেখা যায়। কালো জমিনের ওপর গাঢ় লাল রঙের স্ট্রাইপ বা জ্যামিতিক ফুল তোলা থাকে, যা দেখতে অত্যন্ত রাজকীয় লাগে। বয়স্ক এবং তরুণীদের পোশাকের মোটিফে এবং রঙের গাঢ়ত্বেও তারা সুন্দর পার্থক্য রাখেন।
  • আনুমানিক দাম: সরাসরি কার্বি তাঁতিদের থেকে কেনা একটি ঐতিহ্যবাহী পিনি বা পেকক সেটের দাম সাধারণত ১,২০০ টাকা থেকে ৩,৫০০ টাকার মধ্যে থাকে।

উপসংহার

বোড়ো, মিসিং বা কার্বি—এই উপজাতীয় বুননগুলো কেবল পরার কাপড় নয়, এগুলো ভারতের প্রাচীন শিল্পকলার এক অমূল্য সম্পদ। মেশিনে বোনা সস্তা কাপড়ের ভিড়ে এই হাতে বোনা আদিবাসী শিল্পগুলো আজ হুমকির মুখে।

Vunavya বিশ্বাস করে, এই ঐতিহ্যবাহী বুননগুলোকে সারা ভারতের মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়াই হলো এই শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখার সবচেয়ে ভালো উপায়। আপনি কি কখনো আসামের এই উপজাতীয় নকশার কোনো কাপড় বা শাল ব্যবহার করেছেন? আপনার কোন জনজাতির নকশা সবচেয়ে বেশি ভালো লাগল? কমেন্টে আমাদের সাথে শেয়ার করুন!

Leave a Comment

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Shopping Cart
Scroll to Top