মেঘালয়ের ৩টি ঐতিহ্যবাহী বস্ত্রশিল্প এবং উপজাতীয় পোশাক

Spread the love

মেঘালয়ের ঐতিহ্যবাহী বস্ত্রশিল্পের সম্পূর্ণ গাইড। অহিংস এরি সিল্ক (রাইনডিয়া), খাসি নারীদের ধারা ও জাইনসেম এবং গারো ডাকমান্দার ইতিহাস ও বুননশৈলী সহজ ভাষায় জানুন।

Read this in – English/অসমীয়া/हिन्दी

ভারতের উত্তর-восто কোণে অবস্থিত মেঘালয়কে বলা হয় ‘মেঘের আলয়’। পাহাড় এবং পাইন বনে ঘেরা এই রাজ্যে মূলত খাসি, জয়ন্তিয়া এবং গারো উপজাতির মানুষেরা বাস করেন। এই পাহাড়ি সংস্কৃতির সবচেয়ে সুন্দর অংশ হলো এখানকার ঐতিহ্যবাহী বয়নশিল্প। মেঘালয়ের নারীরা প্রাচীনকাল থেকেই সম্পূর্ণ পরিবেশবান্ধব উপায়ে এমন কিছু কাপড় বুনে আসছেন, যা আজ বিশ্ব ফ্যাশনের আঙিনায় সাস্টেইনেবল ফ্যাশনের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। আজ Vunavya-র বিশেষ মাস্টার ব্লগে আমরা আলোচনা করব মেঘালয়ের ৩টি সবচেয়ে বিখ্যাত টেক্সটাইল হেরিটেজের গভীর ইতিহাস ও কারিগরি রহস্য নিয়ে।

১: রাইনডিয়া বা এরি সিল্ক (Ryndia / Eri Silk) — উমডেন গ্রামের অহিংস সিল্ক

মেঘালয়ের খাসি ও জয়ন্তিয়া সংস্কৃতির এক অমূল্য রত্ন হলো এরি সিল্ক, যা স্থানীয়ভাবে ‘রাইনডিয়া’ (Ryndia) নামে পরিচিত। বিশেষ করে মেঘালয়ের রী-ভোই জেলার উমডেন (Umden) গ্রামকে বলা হয় এরি সিল্কের রাজধানী।

  • পরিবেশবান্ধব ও অহিংস বুনন: রাইনডিয়ার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর তৈরি পদ্ধতি। সাধারণত রেশম পোকাকে না মেরে, তাদের ছেড়ে যাওয়া কোকুন বা গুটি থেকে এই সুতো তৈরি করা হয়। সুতরাং, একে ‘অহিংস সিল্ক’ (Eco-friendly Peace Silk) বলা হয়। খাসি নারীরা বনের বিভিন্ন গাছের পাতা ও ছাল থেকে সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক রঙ তৈরি করে এই সুতো রাঙিয়ে থাকেন।
  • উষ্ণতা ও আরাম: রাইনডিয়া কাপড়টি দেখতে কিছুটা সুতির মতো হলেও এটি সিল্কের মতোই নরম। তাছাড়া এটি শীতকালে শরীরকে উষ্ণ রাখে এবং গ্রীষ্মকালে ঠান্ডা রাখে। ফলে খাসি সমাজে এই শাল বা চাদর অত্যন্ত আভিজাত্যের প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

২: খাসি পোশাক ধারা ও জাইনসেম (Dhara / Jainsem) — খাসি নারীর সাবেকি সাজ

খাসি সম্প্রদায়ের নারীদের ঐতিহ্যবাহী এবং অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ পোশাকের সেট হলো ধারা (Dhara) এবং জাইনসেম (Jainsem)। এটি মূলত খাঁটি সিল্কের কাপড় দিয়ে তৈরি করা হয়।

  • ডিজাইন ও পরার ধরণ: ‘জাইনসেম’ হলো একটি দৈনন্দিন পোশাক, যা দুটি সিল্কের টুকরো কাপড় দিয়ে কাঁধের ওপর আলতো করে বেঁধে পরা হয়। অন্যদিকে, ‘ধারা’ হলো একটি অত্যন্ত ভারী এবং নকশাদার সিল্কের পোশাক। এটি মূলত খাসি নারীরা বিয়ে, উৎসব বা বড় কোনো সামাজিক অনুষ্ঠানে পরিধান করেন।
  • সাংস্কৃতিক প্রতীক: এই পোশাকের বুনন অত্যন্ত ঘন এবং মসৃণ হয়। সাধারণত উজ্জ্বল রঙের সিল্কের সুতো দিয়ে কোমর-তাঁতে এটি বোনা হয়। এর ফলে এই পোশাকটি খাসি নারীদের সামাজিক মর্যাদা এবং আভিজাত্যকে চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তোলে।

৩:গারো ডাকমান্দা (Dakmanda) — — প্রকৃতি ও ফুলের মোটিফ যুক্ত স্কার্ট

মেঘালয়ের গারো পাহাড়ের অধিবাসী গারো (Garo) সম্প্রদায়ের নারীদের হাতে বোনা সবচেয়ে বিখ্যাত ঐতিহ্যবাহী পোশাক হলো ‘ডাকমান্দা’ (Dakmanda)। এটি মূলত একটি জড়িয়ে পরার স্কার্ট (Wrap-around Skirt)।

  • প্রকৃতির মোটিফ: ডাকমান্দা কাপড়ের মূল আকর্ষণ হলো এর গায়ে থাকা চমৎকার নকশা। গারো নারীরা কাপড়ের দুই প্রান্তে সুতোর নিখুঁত টানে বুনো ফুল, প্রজাপতি এবং প্রকৃতির বিভিন্ন জ্যামিতিক মোটিফ ফুটিয়ে তোলেন। একে স্থানীয় ভাষায় ‘রিকিং’ (Riking) বলা হয়।
  • বুননশৈলী: সম্পূর্ণ সুতির সুতো দিয়ে কোমর-তাঁতে অত্যন্ত শক্তভাবে এটি বোনা হয়। তাছাড়া এর উজ্জ্বল রঙের কম্বিনেশন এবং ঘন বুনন একে দৈনন্দিন পাহাড়ের কঠিন পরিশ্রমের কাজের জন্য অত্যন্ত দীর্ঘস্থায়ী করে তোলে।

উপসংহার

মেঘালয়ের এই তিন উপজাতির বস্ত্রশিল্প আমাদের শেখায় কীভাবে প্রকৃতির সাথে তাল মিলিয়ে সম্পূর্ণ পরিবেশবান্ধব উপায়ে শত শত বছর ধরে একটি সংস্কৃতি বেঁচে থাকতে পারে। রাইনডিয়ার অহিংস ছোঁয়া থেকে শুরু করে গারো ডাকমান্দার ফুলের নকশা—প্রতিটি সুতোই যেন উত্তর-পূর্ব ভারতের এক একটি জীবন্ত গল্প। এই অমূল্য পাহাড়ি ঐতিহ্যকে বিশ্বের দরবারে পৌঁছে দিতে Vunavya সবসময় গর্বের সাথে কাজ করে চলেছে।

Shopping Cart
Scroll to Top