ওড়িশার প্রথম জিআই ট্যাগড কোটাপাদ হ্যান্ডলুমের গৌরবময় ইতিহাস

Spread the love

ওড়িশার প্রথম জিআই ট্যাগড কোটাপাদ হ্যান্ডলুমের সম্পূর্ণ গাইড। মিরগান উপজাতির সম্পূর্ণ অর্গানিক ‘আলি’ গাছের শিকড়ের রঙে বুনন ইতিহাস ও মোটিফ সম্পর্কে জানুন।

Read this in – English/हिन्दी/ଓଡ଼ିଆ

ভারতের ওড়িশা রাজ্যের হস্তচালিত তাঁতের প্রতিটি কাপড়ের পেছনে লুকিয়ে থাকে এক আদিম ও প্রাকৃতিক জীবনশৈলী। তেমনই ওড়িশার কোরাপুট জেলার কোটাপাদ অঞ্চলের মিরগান (Mirgan) উপজাতির এক সম্পূর্ণ পরিবেশবান্ধব এবং ঐতিহাসিক বয়নশিল্প হলো ‘কোটাপাদ হ্যান্ডলুম’ (Kotpad Handloom)। এই কাপড়টি কেবল সাধারণ সুতির পোশাক নয়। মূলত এটি হলো ওড়িশার প্রথম টেক্সটাইল যা ভারত সরকারের জিআই ট্যাগ (GI Tag) লাভ করেছে। আজ Vunavya-র এই বিশেষ ব্লগে আমরা আলোচনা করব কোটাপাদ হস্তশিল্পের জটিল কারিগরি মেকানিক্স, এর সম্পূর্ণ অর্গানিক রঙ তৈরি এবং পাঠকদের মনে থাকা কিছু জরুরি প্রশ্নের উত্তর নিয়ে।

১: কোটাপাদ কাপড়ের কারিগরি মেকানিক্স — ‘আলি’ শিকড়ের অর্গানিক জাদু

কোটাপাদ হ্যান্ডলুমের মূল আকর্ষণ এবং আভিজাত্য লুকিয়ে আছে এর সুতো রাঙানোর সম্পূর্ণ ভেষজ ও প্রাকৃতিক পদ্ধতির মধ্যে। কারিগররা কোনো রাসায়নিক ব্যবহার না করে অত্যন্ত ধৈর্যের সাথে এই কাজ করেন।

  • শিকড় থেকে রঙের নিষ্কাশন: এই শিল্পে সুতো রাঙানোর জন্য ‘আলি’ বা ইন্ডিয়ান ম্যাডার (Indian Madder) গাছের শিকড় ব্যবহার করা হয়। এই শিকড়ের গুঁড়োর সাথে ক্যাস্টর অয়েল ও গোবর মিশিয়ে সুতোকে ১৫ থেকে ২১ দিন ধরে ভিজিয়ে রাখা হয়। ফলে কাপড়ের গায়ে এক অদ্ভুত সুন্দর মাটির রঙ বা মেটে-লাল (Earthy Red) এবং গাঢ় চকোলেট রঙ ফুটে ওঠে।
  • ভারী বুননশৈলী: কোটাপাদের সুতি শাড়ি ও ওড়না মূলত মোটা ও খাঁটি সুতির সুতো দিয়ে পিট-লুম বা গর্ত-তাঁতে বোনা হয়। সুতরাং, এই কাপড়গুলো অত্যন্ত মজবুত এবং স্পর্শ করলে এক ধরণের অনন্য পাহাড়ি ও আদিম টেক্সচার অনুভব করা যায়।

২: উপজাতীয় মোটিফ ও আধুনিক সাস্টেইনেবল ফ্যাশন

কোটাপাদ কাপড়ের নকশাগুলো অত্যন্ত সরল হলেও আধুনিক ফ্যাশন ডিজাইনারদের কাছে এর শৈল্পিক মূল্য অনেক বেশি।

  • প্রকৃতির আদিম প্রতীক: কোটাপাদ শাড়ির পাড় এবং জমিনে কারিগররা অতিরিক্ত পোড়েন (Extra Weft) পদ্ধতিতে খুব সাধারণ জ্যামিতিক নকশা বোনেন। এগুলির মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত হলো— কুঠার (Axe), মাছ, হাঁস, ধনুক এবং আদিবাসী উপজাতির বসবাসের ঘর বা ‘মন্দির পাড়’।
  • গ্লোবাল স্লো-ফ্যাশন ট্রেন্ড: বর্তমান যুগে বিশ্বজুড়ে সম্পূর্ণ কেমিক্যাল-মুক্ত এবং জিরো-কার্বন কাপড়ের চাহিদা ব্যাপক। কোটাপাদের এই বিশুদ্ধ অর্গানিক বৈশিষ্ট্যকে ব্যবহার করে বর্তমানের ডিজাইনারা চমৎকার ফিউশন জ্যাকেট, ওড়না এবং প্রিমিয়াম খাদি শাড়ি তৈরি করছেন, যা আন্তর্জাতিক বাজারে সাবেকি আভিজাত্যের প্রতীক।

৩: সাধারণ কিছু প্রশ্ন ও উত্তর (FAQ)

প্রশ্ন ১: কোটাপাদ হ্যান্ডলুম কাপড়ে কি কোনো রাসায়নিক গন্ধ থাকে?

উত্তর: না, আসল কোটাপাদ কাপড়ে কোনো রাসায়নিক গন্ধ থাকে না। তবে যেহেতু এটি সম্পূর্ণ প্রাকৃতিকভাবে ক্যাস্টর অয়েল ও ভেষজ উপাদান দিয়ে তৈরি হয়, তাই নতুন কাপড়ে মাটির বা তেলের একটা খুব সুন্দর অর্গানিক সুগন্ধ থাকে।

প্রশ্ন ২: কোটাপাদ শাড়ি কি গরমকালে পরার জন্য উপযোগী?

উত্তর: হ্যাঁ, একদম! কোটাপাদ হ্যান্ডলুম ১০০% খাঁটি ও মোটা সুতির সুতো দিয়ে বোনা হয়। ফলে এটি খুব সহজে গায়ের ঘাম শুষে নেয় এবং গরমের দিনে শরীরকে অত্যন্ত আরামদায়ক ও ঠাণ্ডা রাখে।

প্রশ্ন ৩: এই অর্গানিক কোটাপাদ কাপড়ের রঙ কি ধুয়ে চলে যায়?

উত্তর: না, কোটাপাদ কাপড়ের প্রাকৃতিক রঙের স্থায়িত্ব অপরিসীম। আলি গাছের শিকড় থেকে তৈরি এই রঙ ধুয়ে তো যায়ই না, বরং যত বেশি ব্যবহার করা হয় এবং কাচা হয়, কাপড়ের ভেতরের মাটির রঙ তত বেশি উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। তবে এটি মৃদু সাবান ও ঠাণ্ডা জলে আলতো করে কাচা উচিত।

উপসংহার

ওড়িশার কোটাপাদ হ্যান্ডলুম আমাদের শেখায় কীভাবে মাটির একদম গভীরে গিয়ে, প্রকৃতির কোনো ক্ষতি না করে শত শত বছর ধরে একটি বিশুদ্ধ বয়ন ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখা যায়। এর প্রতিটি সুতোর রঙের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক একজন উপজাতীয় কারিগরের নীরব সাধনা। এই অমূল্য পরিবেশবান্ধব ঐতিহ্যকে বিশ্বের দরবারে পৌঁছে দিতে এবং আমাদের মাটির পিছনপড়ো কারিগরদের পাশে দাঁড়াতে Vunavya সবসময় গর্বের সাথে কাজ করে চলেছে।

Leave a Comment

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Shopping Cart
Scroll to Top