প্রকৃতির রঙে সাজা আসাম: প্রথাগত প্রাকৃতিক রং তৈরির টেকসই ঐতিহ্য | Vunavya
Read this in – English/असमिया /हिन्दी
আজকের ফ্যাশন দুনিয়ায় যখন কেমিক্যাল বা রাসায়নিক রঙের ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে চারিদিকে হইচই পড়ে গেছে, তখন আসামের প্রত্যন্ত গ্রামগুলোর তাঁতিরা আমাদের দেখাচ্ছেন এক নতুন পথ। যুগের পর যুগ ধরে তারা কোনো কৃত্রিম রং ছাড়াই সম্পূর্ণ পরিবেশবান্ধব উপায়ে প্রকৃতির বুক থেকে তুলে নিচ্ছেন অনন্য সব রং। আজ Vunavya-র এই বিশেষ ব্লগে আমরা জানব, কীভাবে আসামের কারিগররা গাছের ছাল, পাতা আর ফল ব্যবহার করে শাড়ি ও মেখলা চাদর রাঙিয়ে তোলেন।
১. নীল রঙের জাদু: ‘রুম’ পাতা (Rum Leaf)
আসামের উপজাতীয় সম্প্রদায়, বিশেষ করে কার্বি এবং টাই ফাকে (Tai Phake) জনগোষ্ঠীর মানুষেরা এক অদ্ভুত গাছের পাতা ব্যবহার করে উজ্জ্বল নীল রং তৈরি করেন। এই গাছটিকে স্থানীয় ভাষায় ‘রুম’ (Strobilanthes cusia) বলা হয়।
- পদ্ধতি: রুম গাছের পাতাগুলো জল দিয়ে বড় পাত্রে গেঁজিয়ে (Fermentation) তোলা হয়। দীর্ঘ প্রক্রিয়ার পর সেই নির্যাস থেকে এক গাঢ় নীল বা নীলচে-কালো রং পাওয়া যায়, যা কাপড়ে দিলে কখনো চটে যায় না।
ঐতিহ্যবাহী লাল বা খয়েরি রঙের জন্য আসামের তাঁতিরা লতা জাতীয় উদ্ভিদ ‘মঞ্জিষ্ঠা’ (Madder) বা স্থানীয় কিছু গাছের ছাল ব্যবহার করেন।

২. লাল ও বাদামী রঙের আভিজাত্য: মঞ্জিষ্ঠা এবং গাছের ছাল
- পদ্ধতি: গাছের ছাল বা মঞ্জিষ্ঠার মূল রোদে শুকিয়ে প্রথমে গুঁড়ো করা হয়। এরপর ফুটন্ত জলে সেই গুঁড়ো দিয়ে দীর্ঘক্ষণ ফুটিয়ে গাঢ় লাল বা চকোলেট বাদামী রং তৈরি করা হয়। কাপড়ে এই রঙের স্থায়িত্ব বাড়াতে ফিটকিরি বা লোহার মরচে পড়া জল প্রাকৃতি মর্ডান্ট (Mordant) হিসেবে ব্যবহার করা হয়।

৩. হলুদ ও সবুজ রঙের স্নিগ্ধতা
হলুদ রঙের জন্য কাঁচা হলুদ তো ব্যবহার করাই হয়, পাশাপাশি কাঁঠাল গাছের ছাল (Jackfruit Bark) ফুটিয়েও এক অপূর্ব সোনালী-হলুদ রং তৈরি করা হয়। এই হলুদের সাথে রুম পাতার নীল নির্যাস মেশালেই তৈরি হয়ে যায় সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক সবুজ রং।

কেন এই পদ্ধতি আজ অত্যন্ত জরুরি? (Sustainability)
রাসায়নিক রং তৈরির প্রক্রিয়ায় টন টন বিষাক্ত বর্জ্য জল আমাদের নদী-নালাকে দূষিত করে। অন্যদিকে, আসামের এই প্রথাগত পদ্ধতি সম্পূর্ণ জৈব বা অর্গানিক। এই রং তৈরিতে ব্যবহৃত অবশিষ্ট অংশগুলো অনায়াসেই মাটিতে মিশে সার হয়ে যায়। প্রকৃতিকে একটুও ক্ষতি না করে ফ্যাশনকে কীভাবে দীর্ঘস্থায়ী ও সুন্দর করা যায়, আসামের এই প্রাচীন শিল্প তারই এক অনন্য নিদর্শন।
