ত্রিপুরার ঐতিহ্যবাহী বস্ত্রশিল্পের সম্পূর্ণ গাইড। সদ্য জিআই ট্যাগড ত্রিপুরা রিসা, রিগনাই-পাছড়া এবং চাকমা পিনন-হাদির ইতিহাস ও বুননশৈলী সহজ ভাষায় জানুন।
Read this in – English/অসমীয়া/हिन्दी

ভারতের উত্তর-পূর্ব কোণের এক শান্ত ও সবুজ রাজ্য হলো ত্রিপুরা। এখানকার ১৯টি ভিন্ন ভিন্ন উপজাতির সংস্কৃতি ও জীবনধারা অত্যন্ত বৈচিত্র্যময়। এই পাহাড়ি সংস্কৃতির সবচেয়ে রঙিন প্রকাশ ঘটে বোরাক উপত্যকার হস্তচালিত তাঁতে। ত্রিপুরার নারীরা প্রাচীনকাল থেকেই নিজেদের পরিধানের জন্য কোমর-তাঁতে (Loin Loom) এমন কিছু অপূর্ব কাপড় বুনে আসছেন, যা আজ বিশ্ব ফ্যাশনের আঙিনায় সমাদৃত। বিশেষ করে ‘ত্রিপুরা রিসা’ (Tripura Risa) সম্প্রতি ভারত সরকারের মর্যাদাপূর্ণ জিআই ট্যাগ (GI Tag) পেয়েছে। আজ Vunavya-র এই বিশেষ মাস্টার ব্লগে আমরা আলোচনা করব ত্রিপুরার বয়ন ঐতিহ্য এবং কাপড়ের ভেতরের উপজাতীয় মোটিফের গল্প নিয়ে।

১: ত্রিপুরা রিসা, রিগনাই এবং পাছড়া (Risa, Rignai & Pachra) — ত্রিপুরার সাবেকি নারী সাজ
ত্রিপুরার মূল ঐতিহ্যবাহী পোশাকটি মূলত তিনটি অংশ নিয়ে তৈরি। এই তিনটি অংশ হলো রিসা, রিগনাই এবং পাছড়া।
- ত্রিপুরা রিসা (Risa): এটি মূলত একটি ছোট, হাতে বোনা অত্যন্ত নকশাদার সুদৃশ্য চাদর বা স্কার্ফ, যা নারীরা শরীরের উপরের অংশে বা বুকের আবরণ হিসেবে ব্যবহার করেন। তাছাড়া এটি পুরুষদের মাথায় পাগড়ি হিসেবে বা সম্মানিত অতিথিদের উত্তরীয় হিসেবেও দেওয়া হয়। সদ্য পাওয়া জিআই ট্যাগ একে আন্তর্জাতিক বাজারে এক অনন্য মর্যাদা দিয়েছে।
- রিগনাই এবং পাছড়া (Rignai & Pachra): ‘রিগনাই’ হলো নিচের অংশে পরার ঐতিহ্যবাহী জড়ানো স্কার্ট (Wrap-around Skirt)। অন্যদিকে, ‘পাছড়া’ হলো শরীরের উপরের অংশে ওড়নার মতো জড়িয়ে রাখার একটি চওড়া কাপড়। সাধারণত গাঢ় ও উজ্জ্বল রঙের সুতোর নিখুঁত বুননে এগুলি তৈরি হয়।

২: চাকমা টেক্সটাইল (Pinon and Hadi) এবং প্রকৃতির উপজাতীয় মোটিফ
ত্রিপুরার বয়নশিল্পের আরেকটি অত্যন্ত সমৃদ্ধ অংশ হলো চাকমা (Chakma) সম্প্রদায়ের নারীদের হাতে বোনা ঐতিহ্যবাহী পোশাক।
- পিনন এবং হাদি (Pinon & Hadi): চাকমা নারীদের নিচের অংশে জড়ানো স্কার্টকে বলা হয় ‘পিনন’ (Pinon) এবং শরীরের উপরের অংশের ওড়নাকে বলা হয় ‘হাদি’ (Hadi)। এই কাপড়ের মূল বৈশিষ্ট্য হলো এর গাঢ় কালো, নীল এবং লাল রঙের চমৎকার কম্বিনেশন।
- প্রকৃতি ও বিশ্বাসের মোটিফ: ত্রিপুরার উপজাতীয় বুননের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে এর মোটিফ বা নকশায়। তাঁতিরা তাঁদের চারপাশের প্রকৃতি, বুনো ফুল, পাহাড়ের নদী এবং জ্যামিতিক লাইনের মাধ্যমে কাপড়ের জমিন সাজিয়ে তোলেন। একে স্থানীয় ভাষায় ‘কোউবুং’ (Khwbung) বলা হয়। এই নকশাগুলো কেবল সৌন্দর্য নয়, মূলত এগুলি উপজাতিদের প্রাচীন বিশ্বাস এবং প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসাকে ফুটিয়ে তোলে।

উপসংহার
ত্রিপুরার রিসা থেকে শুরু করে চাকমা পিনন-হাদি আমাদের শেখায় কীভাবে প্রকৃতিকে ভালোবেসে শত শত বছর ধরে একটি ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখা যায়। প্রতিটি সুতোর জ্যামিতিক নকশার আড়ালে লুকিয়ে আছে পাহাড়ি জীবনের এক একটি জীবন্ত গল্প। এই অমূল্য লোকশিল্পকে বিশ্বের দরবারে পৌঁছে দিতে এবং আমাদের মাটির পিছনপড়ো কারিগরদের পাশে দাঁড়াতে Vunavya সবসময় গর্বের সাথে কাজ করে চলেছে।
