দার্জিলিং ও কালিম্পং-এর আদিম ‘লেপচা বুনন’ ও ব্যাকস্ট্র্যাপ লুমের জাদু

Spread the love

উত্তরবঙ্গের পাহাড়ি ঐতিহ্য: দার্জিলিং ও কালিম্পং-এর আদিম লেপচা বুনন (Lepcha Weaves) | Vunavya

Read this in – English /हिन्दी / असमोय

উত্তরবঙ্গের পাহাড় বলতেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে কুয়াশা ঘেরা দার্জিলিং কিংবা কালিম্পং-এর মায়াবী রূপ এবং সুগন্ধি চা। কিন্তু এই হিমালয়ের কোলেই লুকিয়ে আছে ভারতের অন্যতম প্রাচীন ও বৈচিত্র্যময় এক বয়ন শিল্প— ‘লেপচা বুনন’ (Lepcha Weaves)। উত্তরবঙ্গের আদি বাসিন্দা লেপচা সম্প্রদায়ের নারীরা যুগ যুগ ধরে সম্পূর্ণ নিজস্ব ঘরানায় এই কাপড় বুনে আসছেন। আজ Vunavya-র পাতায় আমরা অন্বেষণ করব এই লেপচা বুননের আদিম মেকানিক্স, তার অনন্য রঙ এবং কীভাবে একটি সাধারণ ‘ব্যাকস্ট্র্যাপ লুম’ (Backstrap Loom) দিয়ে তৈরি হয় অসাধারণ সব পাহাড়ি টেক্সটাইল।

১. ব্যাকস্ট্র্যাপ লুম (Backstrap Loom): মানবদেহের সাথে তাঁতের মেলবন্ধন

আসামের লয়েন লুমের মতোই, লেপচা বুননের মূল ভিত্তি হলো ‘ব্যাকস্ট্র্যাপ লুম’ বা কোমরে বাঁধা তাঁত। লেপচা ভাষায় এই ঐতিহ্যবাহী তাঁতকে বলা হয় ‘কি’ (Kee)

  • কৌশল ও মেকানিক্স: এই তাঁতের কোনো স্থায়ী কাঠের কাঠামো বা ফ্রেম থাকে না। টানা সুতোর এক প্রান্ত ঘরের দেয়াল বা খুঁটির সাথে শক্ত করে বেঁধে রাখা হয়, আর অন্য প্রান্তটি তাঁতির কোমরের পেছনে একটি চামড়া বা কাপড়ের বেল্টের সাহায্যে আটকানো থাকে। তাঁতি যখন মাটিতে পা ছড়িয়ে বসেন এবং নিজের শরীরকে সামান্য পেছনের দিকে হেলিয়ে দেন, তখনই সুতো টানটান হয়।
  • ধৈর্যের বুনন: এখানে কোনো যান্ত্রিক শাটল বা মাকু থাকে না। বাঁশের কাঠি এবং কাঠের তৈরি এক ধরণের তলোয়ার আকৃতির বাতা (Beater) দিয়ে সুতোকে হাত দিয়ে একটি একটি করে গলিয়ে অত্যন্ত ঘন করে ঠাসা হয়।

২. সুতোর উৎস এবং রঙের সাবেকিয়ানা

প্রাচীনকালে লেপচারা তুলো চাষ করতেন না। তখন তারা পাহাড়ের জঙ্গলে উৎপন্ন এক ধরণের বুনো সিস্নু গাছ (Nettle বা স্থানীয় ভাষায় ‘সিসনু’) এবং গাছের ছাল থেকে অত্যন্ত সূক্ষ্ম আঁশ বা সুতো তৈরি করতেন।

  • রঙের ব্যবহার: লেপচা বুননের কাপড়গুলো দেখলেই চেনা যায় এর চটকদার রঙের বিন্যাসে। ঐতিহ্যগতভাবে তারা গাঢ় নীল, লাল, হলুদ, সাদা এবং কালো রঙের সুতো বেশি ব্যবহার করেন।
  • প্রাকৃতিক রঞ্জক: আগেকার দিনে এই রঙগুলো সম্পূর্ণ প্রাকৃতিকভাবে তৈরি হতো। যেমন— নীল রঙের জন্য বুনো নীল পাতা, কালচে বাদামীর জন্য আখরোটের খোসা এবং হলুদের জন্য কাঁচা হলুদ ব্যবহার করা হতো। বর্তমানে সুতি এবং উলের সুতোর ব্যবহার বাড়লেও, রঙের সেই প্রাচীন বিন্যাস আজও অক্ষুণ্ণ রয়েছে।

৩. লেপচা বুননের বৈশিষ্ট্য: উল্লম্ব রেখা ও জ্যামিতিক মোটিফ

লেপচা কাপড়ের মূল নকশাই হলো উল্লম্ব স্ট্রাইপ বা খাড়া রেখা (Vertical Stripes)। কাপড়ের ওপর চওড়া এবং সরু রেখাগুলো পাশাপাশি এমনভাবে বোনা হয়, যা দূর থেকে দেখলে পাহাড়ের খাঁজ বা উপত্যকার মতো মনে হয়।

ঐতিহ্যবাহী পোশাক: এই বুননে তৈরি কাপড় দিয়ে লেপচা পুরুষেরা তাদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক ‘থোকরো-দুম’ (Thokro-Dum) তৈরি করেন, যা দেখতে একটি সাদা-কালো বা নীল স্ট্রাইপযুক্ত চাদরের মতো। অন্যদিকে মহিলারা পরেন ‘দুম-দুম’ (Dum-Dum) বা ‘দুমদেম’ নামক এক ধরণের জমকালো স্নিগ্ধ পোশাক। এছাড়া এই টেক্সটাইল দিয়ে মজবুত ঝোলা ব্যাগ (Jhora), আসন এবং শীতকালীন চাদর তৈরি করা হয়।

সাস্টেইনেবিলিটি বা টেকসই ফ্যাশনে লেপচা বুনন

বর্তমান যুগের ইকো-ফ্রেন্ডলি বা টেকসই ফ্যাশনের (Sustainable Fashion) জন্য লেপচা বুনন এক অনন্য উদাহরণ। এই কাপড় তৈরিতে কোনো বিদ্যুৎ খরচ হয় না, কোনো রাসায়নিক বর্জ্য উৎপন্ন হয় না এবং এতে ব্যবহৃত প্রাকৃতিক সুতো ও রঙ পরিবেশের বিন্দুমাত্র ক্ষতি করে না। এই বুনন এতটাই শক্ত এবং দীর্ঘস্থায়ী হয় যে বছরের পর বছর ব্যবহারে এর রঙ বা সুতোর বাঁধন আলগা হয় না।

উপসংহার

উত্তরবঙ্গের পাহাড়ি জনজাতির এই লেপচা বুনন কেবল একটি পোশাক তৈরির মাধ্যম নয়, এটি হিমালয়ের কোলে বেঁচে থাকা এক আদিম সংস্কৃতির জীবন্ত দলিল। শত প্রতিকূলতার মাঝেও কালিম্পং ও দার্জিলিং-এর লেপচা নারীরা তাঁদের এই প্রাচীন শিল্পকে বাঁচিয়ে রেখেছেন। সুতোর বুননে প্রকৃতির এই অপরূপ রূপকে বিশ্বের দরবারে পৌঁছে দিতে এবং এই কারিগরদের ঐতিহ্যকে সম্মান জানাতে Vunavya সবসময় সচেষ্ট।

Shopping Cart
Scroll to Top