নকশী কাঁথা কিভাবে তৈরী হয় ?

বাংলার সুতোয় বোনা নকশা, লোককথা ও ঐতিহ্যের ইতিকথা

বাংলার বস্ত্রশিল্পের ইতিহাস ঘাঁটলে এমন অনেক রত্নের সন্ধান পাওয়া যায়, যা শুধু ভারতেই নয়, সমগ্র বিশ্বে সমাদৃত। আমাদের Vunavyaর বস্ত্র ঐতিহ্যের পাতায় আজ আমরা এমন এক শিল্পের গল্প বলব, যা শুধু একটি সেলাই নয়, বরং বাংলার নারীদের শত শত বছরের আবেগ, লোককথা এবং জীবনের ক্যানভাস। সেই অনবদ্য শিল্পের নাম— নকশী কাঁথা

Read this in :- English /हिन्दी

নকশী কাঁথার জন্ম: পুরনো কাপড়ে নতুন প্রাণ

‘নকশী’ কথাটির অর্থ হলো নকশা বা ডিজাইন। আগেকার দিনে গ্রামবাংলার মহিলারা শীতের হাত থেকে বাঁচার জন্য পুরনো সুতির শাড়ি বা ধুতি স্তরে স্তরে সাজিয়ে, শাড়ির পাড় থেকে রঙিন সুতো তুলে সেলাই করতেন এবং এখনো গ্রাম বাংলার ভিতরে এই কাজ হয়ে চলেছে। এটি ছিল ফেলে দেওয়া বা পুরনো কাপড়কে পুনর্ব্যবহার (Recycle) করার একটি অসাধারণ দেশীয়  উপায় এবং প্রাচীন কাল থেকেই ভারতীয় রা যুগাডু  মোনের হয়ে এসছে। শীতের শুরুতে হোক  বা কোনো পরিবারে নতুন সন্তান এর জন্ম গ্রামবাংলার প্রতিটি ঘরে শুরু হতো কাঁথা বোনার কাজ। শীতের জন্য বড়ো চাদরের আকারের এবং নবজাত শিশুর জন্য ছোট্ট ছোট্ট কাঁথা তৈরী করে ঠাকুমা ,মাসীমা ,বড়মা,পিসীমা সকলে মিলে উপহার দিতো। সাধারণ সেলাইয়ের গণ্ডি পেরিয়ে যখন সেই কাঁথায় বিভিন্ন নকশা বা গল্প ফুটে উঠত, তখন তা হয়ে উঠত ‘নকশী কাঁথা’।

সুতো দিয়ে বোনা অব্যক্ত গল্প (The Canvas of Storytelling)

নকশী কাঁথাকে বলা হয় বাংলার মহিলাদের ‘ডায়েরি’। শত শত বছর আগে, যখন মহিলাদের নিজস্ব কথা বলার বা শিল্পচর্চার খুব বেশি মাধ্যম ছিল না, তখন তারা সুতো আর ছুঁচের ফোঁড়ে নিজেদের সুখ-দুঃখ, রূপকথা, আর দৈনন্দিন জীবনের গল্প কাপড়ের ওপর ফুটিয়ে তুলতেন। দুপুরের অবসরে দাওয়ায় বসে মহিলারা যখন কাঁথা সেলাই করতেন, তখন সেই কাপড়ের বুননে মিশে যেত তাদের স্বপ্ন আর ভালোবাসা।

জনপ্রিয় মোটিফ: নকশায় গ্রামবাংলার প্রতিচ্ছবি

নকশী কাঁথায় সাধারণত গ্রামবাংলার প্রকৃতি এবং দৈনন্দিন জীবনের ছোঁয়া থাকে। এর মধ্যে অন্যতম প্রধান মোটিফগুলো হলো:

  • কেন্দ্রস্থল: সাধারণত একদম মাঝখানে থাকে প্রস্ফুটিত  শতদল বা পদ্মফুল।
  • প্রকৃতি: জীবনবৃক্ষ (Tree of life), পাতা, এবং বিভিন্ন ধরনের ফুল।
  • প্রাণীজগৎ: পাখি, মাছ, হাতি, ঘোড়া ও ময়ূর।
  • দৈনন্দিন জীবন: গ্রামের সাধারণ দৃশ্য, পালকি, এবং পৌরাণিক নানা কাহিনী।

বাংলার ভৌগোলিক স্বীকৃতি ও প্রধান কেন্দ্র (The GI Tag Hubs)

বাংলার এই নিজস্ব শিল্প ২০০৮ সালে  আন্তর্জাতিক স্তরে ভৌগোলিক স্বীকৃতি বা জিআই (GI) ট্যাগ লাভ করেছে। যদিও সমগ্র পশ্চিমবঙ্গ এই ট্যাগের অধিকারী, তবে নকশী কাঁথার সবথেকে নিখুঁত এবং আসল কাজ হয় নির্দিষ্ট কিছু জেলায়:

  • বীরভূম: বীরভূমের বোলপুর, শান্তিনিকেতন এবং নানুর (Nanoor) এলাকাকে নকশী কাঁথার রাজধানী বলা যেতে পারে। এখানকার কয়েক হাজার মহিলা শিল্পী বংশপরম্পরায় এই কাজ করে চলেছেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের হাত ধরে শান্তিনিকেতনে এই শিল্পের যে আধুনিক রূপান্তর ঘটেছিল, তা আজ বিশ্বজুড়ে সমাদৃত।
  • মুর্শিদাবাদ ও বর্ধমান: বীরভূমের পাশাপাশি মুর্শিদাবাদের কান্দি এবং পূর্ব বর্ধমানের কেতুগ্রাম ও মঙ্গলকোট এলাকাতেও অত্যন্ত সূক্ষ্ম এবং ঐতিহ্যবাহী কাঁথার কাজ হয়।

আধুনিক ফ্যাশনে নকশী কাঁথার বিবর্তন

সময়ের সাথে সাথে নকশী কাঁথা পুরনো কাপড় এবং লেপের গণ্ডি ছাড়িয়ে আধুনিক লাক্সারি ফ্যাশনে প্রবেশ করেছে। বর্তমানে বাংলার প্রিমিয়াম হ্যান্ডলুম শাড়ি, যেমন— পিওর তসর (Pure Tussar), বিষ্ণুপুরী সিল্ক, মুর্শিদাবাদ সিল্ক, গরদ এবং খাদি কটনের ওপর কাঁথা স্টিচের কাজ করা হয়। একটি ভারী কাজের নকশী কাঁথা শাড়ি শেষ করতে একজন শিল্পীর ৩ থেকে ৬ মাস পর্যন্ত সময় লাগতে পারে! কল্পনা করুন যে কাজ কেবল মাত্র কিছুটা প্রয়োজন মেটাতে লাগছিল সেটিকে এখন ব্যবহার করে দামী ব্রান্ড তৈরী হচ্ছে এবং বিশ্ব দরবারে সম্মান পাচ্ছে। 

Vunavya বিশ্বাস করে, প্রকৃত ফ্যাশন শুধু বাইরের সৌন্দর্য নয়, বরং শেকড়ের সাথে যুক্ত থাকা। বাংলার এই প্রাচীন শিল্পীদের সম্মান জানাতে এবং তাদের হাতের জাদু আপনাদের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

বাংলার এই অনবদ্য শিল্পকে আরও ছড়িয়ে দিতে লেখাটি শেয়ার করুন!

Leave a Comment

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Shopping Cart
Scroll to Top