বাঙালি নারীর ব্লাউজের বিবর্তন: জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ি থেকে আজকের ফ্যাশন
Read this in –English / हिन्दी
শাড়ি—বাঙালি নারীর আভিজাত্য ও সৌন্দর্যের সবচেয়ে বড় প্রতীক। কিন্তু আপনি কি জানেন, যে শাড়ির সাথে ম্যাচিং ব্লাউজ ছাড়া আজ আমাদের সাজগোজ অসম্পূর্ণ, একসময় সেই ব্লাউজের কোনো অস্তিত্বই বাংলার বুকে ছিল না?
প্রাচীনকাল থেকে শুরু করে উনিশ শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত বাঙালি মেয়েরা শাড়ি পরতেন কোনো সেলাই করা অন্তর্বাস বা ব্লাউজ ছাড়াই। শুধুমাত্র একটি দীর্ঘ কাপড় (শাড়ি) গায়ে জড়িয়ে নেওয়াই ছিল তখনকার চল। তাহলে, আজ আমরা যে আধুনিক কাট ও ডিজাইনের ব্লাউজ পরছি, তা কোথা থেকে এল? এর পেছনে লুকিয়ে আছে এক যুগান্তকারী ইতিহাস, যার শুরুটা হয়েছিল জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহল থেকে।
ইতিহাসের মোড় ঘোরানো সেই ঘটনা
উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধ। ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী তখন কলকাতা। সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মেজদাদা) ছিলেন প্রথম ভারতীয় আইসিএস (ICS) অফিসার। তাঁর স্ত্রী, জ্ঞানদানন্দিনী দেবী একবার এক ব্রিটিশ ক্লাবে প্রবেশের চেষ্টা করেন। কিন্তু সে যুগে বাঙালি মেয়েদের শুধু শাড়ি জড়ানো পোশাককে ব্রিটিশরা “অশালীন” বলে গণ্য করে এবং তাঁকে ক্লাবে ঢুকতে দেওয়া হয়নি।
এই অপমানই জন্ম দিয়েছিল এক নতুন ফ্যাশন বিপ্লবের।
পার্সি স্টাইলের অনুপ্রেরণা ও ‘ব্রাহ্মিকা শাড়ি’

এই ঘটনার পর স্বামী সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাথে বোম্বে (মুম্বাই) থাকার সময় জ্ঞানদানন্দিনী দেবী খেয়াল করেন পার্সি এবং গুজরাটি নারীদের পোশাক। তারা শাড়ির নিচে পেটিকোট এবং গায়ে সেলাই করা ‘জ্যাকেট’ বা শার্ট (যাকে তখন শেমিজ বলা হতো) পরতেন।
তিনি সেই স্টাইলটি গ্রহণ করেন এবং বাংলার আবহাওয়ার সাথে মানিয়ে তাতে কিছু পরিবর্তন আনেন। তিনি শাড়ির আঁচল বাঁ কাঁধে ফেলে পরার যে নতুন স্টাইল তৈরি করলেন, তা ইতিহাসে ‘ব্রাহ্মিকা শাড়ি’ নামে পরিচিত হলো। আর সেই শাড়ির সাথেই বাঙালি নারীদের জীবনে প্রথম প্রবেশ করল সেলাই করা ‘ব্লাউজ’।

ঠাকুরবাড়ির হাত ধরে ব্লাউজের প্রচার
জ্ঞানদানন্দিনী দেবী শুধু নিজের পোশাকই বদলাননি, তিনি চেয়েছিলেন বাংলার সব নারী এই আধুনিক ও শালীন পোশাক পরতে শিখুক। তিনি রীতিমতো খবরের কাগজে (বামাবোধিনী পত্রিকা) বিজ্ঞাপন দিয়ে মেয়েদের শাড়ি ও ব্লাউজ পরা শেখানোর উদ্যোগ নেন।
সে যুগে কলকাতার দর্জিরা এই নতুন ধরনের পোশাকের নাম দিয়েছিলেন ‘জ্যাকেট’ বা ‘বডিস’। ভিক্টোরিয়ান ফ্যাশনের আদলে তৈরি এই ব্লাউজগুলোর গলা থাকত একদম উঁচু (High-neck), হাতা হতো কবজি পর্যন্ত লম্বা, আর বুকে বা হাতায় থাকত লেস বা কুঁচির (Ruffle) কাজ।
যুগ পরিবর্তনের সাথে ব্লাউজের বিবর্তন
ঠাকুরবাড়ির হাত ধরে শুরু হওয়া সেই ব্লাউজ সময়ের সাথে সাথে বদলাতে থাকে:
- ১৯৪০-৫০ এর দশক: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর কাপড়ের দাম বাড়ায় ব্লাউজের হাতা ছোট হতে শুরু করে। এসময় ‘পাফ স্লিভ’ (Puff sleeve) বা ঘটি হাতা ব্লাউজের দারুণ চল শুরু হয়।
- ১৯৬০-৭০ এর দশক: বলিউড এবং টলিউডের নায়িকাদের হাত ধরে এল স্লিভলেস (Sleeveless) এবং ডিপ-নেক ব্লাউজ। ব্লাউজ হয়ে উঠল নারীর ব্যক্তিত্ব প্রকাশের অন্যতম মাধ্যম।
- আজকের দিন: একসময় যা ছিল শুধুই শরীর ঢাকার আবরণ, আজ তা একটি ‘স্টেটমেন্ট পিস’। এখন একটি সাধারণ সুতির শাড়ির সাথে একটি ভারী এমব্রয়ডারি করা, ব্যাকলেস বা ডিজাইনার ব্লাউজ পুরো লুকটাই বদলে দেয়।

ঐতিহ্যের সাথে আধুনিকতার মেলবন্ধন
ব্লাউজের এই বিবর্তন আমাদের শেখায় যে, ফ্যাশন কখনোই থেমে থাকে না। তবে আধুনিকতার সাথে ঐতিহ্যের ছোঁয়া থাকলে তার আবেদন হয় চিরন্তন। বাংলার সেই আভিজাত্যকে ধরে রাখতেই Vunavya কাজ করে চলেছে বাংলার খাঁটি হ্যান্ডলুম শাড়ি নিয়ে।
আমাদের একটি ঐতিহ্যবাহী গরদ বা বালুচরী শাড়ির সাথে যদি আপনি ঠাকুরবাড়ির সেই ‘হাই-নেক’ ভিন্টেজ স্টাইলের ব্লাউজ পরেন, তবে তা এক অন্যরকম সাবেকি লুক তৈরি করবে।
আপনার সবচেয়ে পছন্দের ব্লাউজের ডিজাইন কোনটি? ভিন্টেজ ঘটি হাতা নাকি আধুনিক স্লিভলেস? কমেন্ট করে আমাদের জানান, আর বাংলার এমন আরও অজানা টেক্সটাইল ইতিহাস জানতে চোখ রাখুন Vunavya-এর ব্লগে!
