অসমের বস্ত্রশিল্পের এক অমূল্য সোনালী বিস্ময় -মুগা সিল্ক
Read this in- অসমিয়া/हिन्दी/English
ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য অসমের ব্রহ্মপুত্র উপত্যকা থেকে আসা ‘মুগা সিল্ক’ কেবল একটি কাপড় নয়, এটি একটি ঐতিহ্য।মুগা সিল্ক কে বলা হয় সকল সিল্ক এর রাজা এবং এই সিল্ক এর বর্তমান কেজি প্রতি মূল্য প্রায় ৪০০০০ – ৫০০০০ (চল্লিশ হাজার টাকা থেকে পঞ্চাশ হাজার টাকা )। বিশ্বের আর কোথাও এই বিশেষ ধরনের রেশম পাওয়া যায় না। এর উজ্জ্বল সোনালী আভা এবং দীর্ঘস্থায়িত্বের কারণে একে ‘গোল্ডেন ফাইবার’ বলা হয়।সাধারনত খাঁটি মুগা সিল্ক এর শাড়ী ১০০ বছরের ও অধিক সময় পর্যন্ত অক্ষত থাকে।
কেন মুগা সিল্ক অনন্য?
মুগা সিল্কের সৌন্দর্য শুধু বাইরে নয়, এর গুনাগুন চিকিৎসাবিজ্ঞানেও প্রমাণিত। এটি ত্বকের জন্য অত্যন্ত আরামদায়ক এবং একজিমা বা অ্যালার্জির মতো সমস্যায় আক্রান্তদের জন্য সেরা পোশাক। এছাড়া এই প্রাকৃতিক তন্তু আমাদের ত্বককে সূর্যের ক্ষতিকর অতিবেগুনি রশ্মি (UV rays) থেকে রক্ষা করে। বর্তমানের টেকসই ফ্যাশন (Sustainable Fashion) জগতে এটি ১০০% বায়োডিগ্রেডেবল এবং পরিবেশবান্ধব।
মুগা সিল্কের অনন্য বৈশিষ্ট্য
১. প্রাকৃতিক সোনালী রং: এই সিল্কের বিশেষত্ব হলো এর রঙ। এটি কৃত্রিমভাবে রাঙানো হয় না, পোকা থেকেই এই সোনালী আভা পাওয়া যায়।
২. দীর্ঘস্থায়িত্ব: বলা হয় যে, একটি মুগা শাড়ি তার মালিকের চেয়েও বেশিদিন স্থায়ী হয়। সময়ের সাথে সাথে এর উজ্জ্বলতা কমে না, বরং বৃদ্ধি পায়।
৩. আভিজাত্যের প্রতীক: প্রাচীনকালে অসমের আহোম রাজবংশের রাজারা এই সিল্ক ব্যবহার করতেন। আজও এটি আভিজাত্য এবং সংস্কৃতির প্রতীক।

উৎপত্তি ও বুনন প্রক্রিয়া
মুগা সিল্ক তৈরি হয় Antheraea assamensis নামক এক বিশেষ প্রজাতির রেশম পোকা থেকে। এই পোকাগুলো মূলত ‘সোম’ এবং ‘সোয়ালু’ গাছের পাতা খেয়ে বেড়ে ওঠে।সারা বছরে মাত্র তিনটি মাস এই সিল্ক এর উত্পাদন করা যায়। বুনন শিল্পীরা অত্যন্ত ধৈর্যের সাথে এই পোকা থেকে সোনালী সুতো সংগ্রহ করেন এবং তাঁতে বুনে তৈরি করেন অপূর্ব সব শাড়ি ও মেখলা চাদর।আসল মুগা শাড়িতে সাধারণত নকশা তোলার জন্য ‘এরি’ (Eri) সুতো ব্যবহার করা হয়। অসমের ঐতিহ্যবাহী ‘কিংখাপ’ (Kingkhap) এবং ‘পার্বতী’ (Parboti) মোটিফগুলো যখন সাদা এরি সুতো ও রঙিন মীনাকারি কাজের সাথে শাড়ির জমিনে ফুটে ওঠে, তখন তা এক অপূর্ব রূপ ধারণ করে। আগেকার দিনে মুগা শাড়িতে কড়া মাড় (Starch) দেওয়া হতো, কিন্তু আধুনিক যুগে আমরা হালকা মাড় ব্যবহার করি যাতে শাড়িটি শরীরের সাথে সুন্দরভাবে মানায়।

মুগা সিল্কের শাড়ি ও নকশা
মুগা সিল্ক দিয়ে তৈরি শাড়ি ও মেখলা চাদরে সাধারণত প্রকৃতির মোটিফ দেখা যায়। জাপি (অসমীয়া টুপি), ঢোল, পেপা (শিঙার বাঁশি), ফুল এবং লতাপাতার কারুকাজ এই শাড়িগুলোকে অনন্য করে তোলে। বর্তমান যুগে শাড়ির পাশাপাশি মুগা সিল্ক দিয়ে কুর্তা, জ্যাকেট এবং আধুনিক পোশাকও তৈরি হচ্ছে।
১. সুতো প্রস্তুতি (Silk Reeling)
গুটি (Cocoons) থেকে সুতো বের করার পর তা পরিষ্কার করা হয়।একটি গুটি থেকে ১০০০ মিটার পর্যন্ত সুতো পাওয়া যায়। মুগা সিল্কের প্রাকৃতিক সোনালী আভা এতটাই উজ্জ্বল যে এতে সাধারণত কোনো কৃত্রিম রঙের প্রয়োজন হয় না। তবে বুননের আগে সুতোগুলোকে মাড় দিয়ে শক্ত করে নেওয়া হয় যাতে হ্যান্ডলুমে বুনতে সুবিধা হয়।
২. তাঁত বা হ্যান্ডলুম সেটআপ
মুগা শাড়ি সাধারণত ‘থ্রো-শাটল’ (Throw-shuttle) বা ‘ফ্লাই-শাটল’ (Fly-shuttle) পিট লুম বা ফ্রেম লুমে বোনা হয়।
- টানা (Warp): শাড়ির লম্বালম্বি সুতো সেট করা।
- ভড়ানি (Weft): আড়াআড়িভাবে সুতো চালানো।
৩. নকশা তৈরির পদ্ধতি (Traditional Motifs)
মুগা শাড়িতে নকশা করার জন্য মূলত দুটি প্রধান পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়:
- জ্যাকার্ড মেকানিজম (Jacquard Mechanism): আধুনিক হ্যান্ডলুমে জ্যাকার্ড কার্ড ব্যবহার করা হয়। এখানে পাঞ্চ করা কার্ডের মাধ্যমে তাঁতি ঠিক করেন কোথায় কোন সুতো উঠবে, যার ফলে জটিল সব নকশা ফুটে ওঠে।
- অতিরিক্ত সুতোর কাজ (Extra Weft Technique): এটিই হ্যান্ডলুমের আসল কারিশমা। শাড়ির মূল জমিন বোনার সময় আলাদা রঙের (সাধারণত লাল, কালো বা সবুজ) সুতো বা সোনা-রুপালি জরি দিয়ে সুঁই বা ছোট মাকু ব্যবহার করে হাতে নকশা তোলা হয়। একে স্থানীয় ভাষায় ‘ফুল বাছা’ বলা হয়।
৪. জনপ্রিয় কিছু নকশা
মুগা শাড়ির নকশায় আসামের প্রকৃতি এবং সংস্কৃতির ছাপ স্পষ্ট থাকে:
- মোবাইল (Miri Design): জ্যামিতিক নকশা।
- কাজিরঙা মোটিফ: হাতি, হরিণ বা পাখির নকশা।
- ফুল ও লতা-পাতা: বিশেষ করে ‘গড়গড়’ বা ছোট ছোট বুটি।
- জাঁপি ও ঢোল: আসামের সংস্কৃতির প্রতীক হিসেবে এই নকশাগুলোও পাড়ে বা আঁচলে দেখা যায়।
৫. বুনন প্রক্রিয়া
একজন দক্ষ তাঁতি প্রতিদিন মাত্র কয়েক ইঞ্চি মুগা শাড়ি বুনতে পারেন। একটি সম্পূর্ণ মুগা শাড়ি তৈরি করতে নকশার জটিলতা অনুযায়ী ১০ থেকে ৩০ দিন বা তার বেশি সময় লাগতে পারে।
চেনার উপায়
- উজ্জ্বল সোনালী রঙ: মুগা সিল্কের প্রাকৃতিক রঙ সোনালী। এটি কোনো কৃত্রিম রঙ নয়। ধোয়ার পর বা সময় বাড়ার সাথে সাথে এর উজ্জ্বলতা কমে না, বরং আরও বাড়ে।
- পোড়ানো পরীক্ষা (Burn Test): শাড়ির কোণ থেকে একটি সুতো বের করে পুড়িয়ে দেখুন। খাঁটি সিল্ক পুড়লে মানুষের চুল পোড়ার মতো গন্ধ আসবে এবং অবশিষ্টাংশ কালো ছাইয়ের মতো হবে (যা আঙুল দিয়ে চাপ দিলে গুঁড়ো হয়ে যাবে)। যদি প্লাস্টিক পোড়ার গন্ধ আসে বা শক্ত দলা পাকিয়ে যায়, তবে বুঝবেন সেটি মিশ্র বা কৃত্রিম সিল্ক।
- স্পর্শ ও অনুভূতি: মুগা সিল্ক সাধারণত একটু খসখসে বা দানাদার টেক্সচারের হয়, কিন্তু পরলে এটি খুব আরামদায়ক। এটি খুব বেশি পিচ্ছিল হয় না।
- সিল্ক মার্ক (Silk Mark): কেনার সময় সবসময় ভারত সরকারের ‘Silk Mark’ লোগো দেখে কিনবেন। এটি খাঁটি সিল্কের গ্যারান্টি দেয়।
- বুননের অসংগতি: যেহেতু এটি হ্যান্ডলুমে তৈরি হয়, তাই খুব খুঁটিয়ে দেখলে বুননের মধ্যে সামান্য অসমান ভাব বা ছোট ছোট গিঁট চোখে পড়তে পারে, যা মেশিনে তৈরি কাপড়ে থাকে না।

রক্ষণাবেক্ষণ বা যত্নের উপায়
মুগা সিল্ক শত বছরেরও বেশি স্থায়ী হতে পারে যদি সঠিক যত্ন নেওয়া হয়:
- ধোয়া (Washing):
- প্রথম কয়েকবার ড্রাই ক্লিন (Dry Clean) করানোই সবচেয়ে ভালো।
- বাড়িতে ধুতে চাইলে হালকা ঠাণ্ডা জল এবং খুব মৃদু শ্যাম্পু বা রিঠা ব্যবহার করুন। কখনো ডিটারজেন্ট দিয়ে ঘষবেন না।
- ধোয়ার পর জল নিংড়াবেন না, বরং একটি তোয়ালেতে জড়িয়ে অতিরিক্ত জল শুষে নিয়ে ছায়াযুক্ত স্থানে শুকাতে দিন।
- ইস্ত্রি করা (Ironing):
- সরাসরি খুব গরম ইস্ত্রি কাপড়ে লাগাবেন না। কাপড়টি সামান্য ভেজা থাকা অবস্থায় উল্টো দিক থেকে হালকা তাপে ইস্ত্রি করুন। সবচেয়ে ভালো হয় যদি উপরে একটি পাতলা সুতির কাপড় রেখে তার ওপর দিয়ে ইস্ত্রি করেন।
- সংরক্ষণ (Storage):
- প্লাস্টিকের প্যাকেটে মুগা শাড়ি রাখবেন না; এতে সিল্কের তন্তু নষ্ট হয়ে যায়। সবসময় সুতির সাদা কাপড় বা মসলিন কাপড়ে মুড়িয়ে রাখুন।
- মাঝেমধ্যে (৩-৪ মাস অন্তর) আলমারি থেকে বের করে ছায়ায় বাতাস দিন এবং ভাঁজ বদলে রাখুন। এক ভাঁজে অনেকদিন থাকলে কাপড়ে দাগ পড়ে যেতে পারে।
- পারফিউম ও ন্যাপথলিন:
- সরাসরি শাড়িতে পারফিউম ছিটাবেন না, এতে সিল্কের রঙ নষ্ট হতে পারে। এছাড়া ন্যাপথলিন বল সরাসরি কাপড়ের সংস্পর্শে না রাখাই ভালো ।
মুগা সুতোর দাম কেজি প্রতি ৫০,০০০ টাকা হলেও শাড়ির দাম কম কেন হয়?
যদি কোনো শাড়ি ১০০% খাঁটি মুগা সিল্ক (Pure Muga Silk) দিয়ে তৈরি হয়, তবে তার দাম কখনোই কম হয় না। একটি খাঁটি মুগা সিল্ক শাড়ির দাম সাধারণত ৪০,০০০ থেকে ৫০,০০০ টাকা থেকে শুরু করে কয়েক লক্ষ টাকা পর্যন্ত হতে পারে।
তাহলে বাজারে যে মুগা শাড়িগুলো কম দামে (যেমন ১০,০০০ থেকে ২০,০০০ টাকা বা তার কম) পাওয়া যায়, তার কারণগুলো হলো:
- সুতোর মিশ্রণ (Blending): খরচ কমানোর জন্য তাঁতিরা অনেক সময় টানা (Warp) বা বেনা (Weft)-র যেকোনো একদিকে খাঁটি মুগা সুতো এবং অন্যদিকে সস্তা সিল্ক (যেমন তসর, মালবেরি বা এরি সিল্ক) অথবা সুতি (Cotton) সুতো ব্যবহার করেন।
- আধা-মুগা বা সেমি-মুগা (Semi-Muga): বাজারে অনেক সময় কৃত্রিম সিল্ক বা পলিয়েস্টার মিশ্রিত সুতো দিয়ে মুগা সিল্কের মতো দেখতে শাড়ি তৈরি করা হয়, যেগুলোর দাম বেশ কম হয়।
- পাওয়ারলুম বনাম হ্যান্ডলুম: খাঁটি মুগা শাড়ি সাধারণত হাতে বোনা (Handloom) হয়, যা অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ। কিন্তু কম দামি শাড়িগুলো আধুনিক পাওয়ারলুমে (Powerloom) দ্রুত তৈরি করা হয়, ফলে উৎপাদন খরচ কমে যায়।
একটি মুগা সিল্ক শাড়ি তৈরি করতে কতটা পরিমাণ সুতো লাগে?
- একটি সাধারণ মাপের (৫.৫ থেকে ৬ মিটার) মুগা সিল্ক শাড়ি তৈরি করতে সাধারণত ৪৫০ গ্রাম থেকে ৬০০ গ্রাম খাঁটি মুগা সুতোর প্রয়োজন হয়।
- শাড়ির বুনন যদি খুব ঘন হয় বা তাতে যদি ভারী নকশা/জরির কাজ থাকে, তবে সুতোর পরিমাণ বেড়ে ৭০০ থেকে ৮০০ গ্রাম পর্যন্ত হতে পারে।
হিসাব করে দেখলে: যদি ৫০০ গ্রাম সুতোও লাগে, তবে শুধুমাত্র কাঁচামালের (সুতো) খরচই আসে প্রায় ২৫,০০০ টাকা। এর সাথে যুক্ত হয় তাঁতির মজুরি, ডাইং এবং ডিজাইনের খরচ। সেই কারণেই খাঁটি মুগা শাড়ির দাম এত বেশি হয়।
একটি জরুরি সতর্কবার্তা
জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এই বিশেষ রেশম পোকাগুলি এখন বিলুপ্তির মুখে। ধারণা করা হচ্ছে, আগামী ১০-১৫ বছরের মধ্যে মুগা সিল্ক পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে। তাই একটি মুগা শাড়ি সংগ্রহে রাখা মানে ইতিহাসের একটি বিলুপ্তপ্রায় অংশকে ধারণ করা।Vunavya-র উদ্দেশ্য হলো এই মহান ঐতিহ্যকে আপনাদের সামনে সঠিক ও বিশুদ্ধ রূপে উপস্থাপন করা।
